When turned on automatically changes
the theme color on reload.
When turned on automatically changes
the theme color every 5 sec.
আপনি কখনো এমন অনুভব করেছেন যে, আপনার চারপাশের মানুষ আপনাকে আপনার নিজের স্মৃতি, অনুভূতি ও বিচারক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান করে তুলছে? কখনো কি এমন হয়েছে যে, আপনি একদম নিশ্চিত ছিলেন যে কোনো ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু অন্যরা বলছে, "এটা তো হয়নি," বা "তুমি ভুল মনে করছো"? যদি এমন কিছু হয়ে থাকে, তাহলে আপনি সম্ভবত গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার হচ্ছেন।
গ্যাসলাইটিং এমন এক ধরনের মানসিক খেলা, যা ধীরে ধীরে আপনার নিজস্ব বাস্তবতা ও উপলব্ধি সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি করে। আপনি কখনও ভাবতে পারবেন না যে, আপনার মনে হওয়া যে ঘটনাগুলি বাস্তবে ঘটেছিল, সেগুলো মিথ্যা বলে প্রমাণিত হতে পারে। গ্যাসলাইটিং এমন এক শক্তিশালী অস্ত্র, যা সরাসরি আঘাত না করে, কিন্তু ধীরে ধীরে আপনাকে মানসিকভাবে নিঃশেষ করে দেয়।
গ্যাসলাইটিং শব্দটি এসেছে ১৯৪৪ সালের একটি সিনেমা "Gaslight" থেকে, যেখানে একজন স্বামী তার স্ত্রীর মনে সন্দেহ তৈরি করে এবং তার বাস্তবতা পালটে দেয়। এই কৌশলটি মানুষকে তার বাস্তবতা নিয়ে মিথ্যা বিশ্বাসে ফেলে দেয়, যেন সে নিজের চিন্তা এবং অনুভূতির ওপর অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
আজকে আমরা জানবো, কীভাবে গ্যাসলাইটিং কাজ করে, কেন এটি এত বিপজ্জনক এবং কীভাবে আপনি এটি থেকে মুক্তি পাবেন।
গ্যাসলাইটিং কীভাবে কাজ করে?
গ্যাসলাইটিং সাধারণত পাঁচটি ধাপে ঘটে, যেখানে প্রথমেই শুরু হয় মিথ্যার বীজ বপন থেকে, এবং শেষ হয় আপনার আত্মবিশ্বাসের পূর্ণ ধ্বংসের মাধ্যমে। প্রতিটি ধাপেই শিকারকে ধীরে ধীরে তার বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
প্রথমেই গ্যাসলাইটার কিছু মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে। এই মিথ্যা খুব সাধারণভাবে ও প্রাকৃতিকভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে আপনি সহজে বুঝতে না পারেন। এটি প্রাথমিকভাবে ছোট হতে পারে, কিন্তু এটি আপনাকে ধীরে ধীরে বিভ্রান্ত করতে থাকে।
উদাহরণ: ধরুন, আপনি একটি পার্টিতে কোনো ঘটনা ঘটতে দেখেছেন। যখন আপনি সেই ঘটনাটি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গ্যাসলাইটার বলে, "তুমি তো ভুল মনে করছো। এমন কিছু হয়নি।"
এখন, আপনি কি মনে করতে শুরু করবেন? "আসলেই কি এমন কিছু ঘটেছিল?" এই সন্দেহ থেকেই গ্যাসলাইটিংয়ের কৌশল শুরু হয়।
গ্যাসলাইটার তার শিকারকে প্রমাণে অপমানিত করতে শুরু করে। যখন শিকার তাদের অনুভূতি বা স্মৃতি নিয়ে কথা বলে, গ্যাসলাইটার তাদের উপহাস করতে থাকে। তারা বলবে, "তুমি তো সবসময় আবেগপ্রবণ," অথবা "তুমি কখনও ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারো না।"
এই কথাগুলোর মাধ্যমে শিকার তার নিজস্ব অনুভূতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করে।
উদাহরণ: আপনি যখন বলবেন, “আমি মনে করি, তুমি আমাকে অপমান করেছো,” তখন গ্যাসলাইটার বলবে, “তুমি তো সবসময় ভুল বুঝে ফেলো, তুমি কেন এত বেশি আবেগপ্রবণ হয়ো?”
এভাবে, শিকার নিজেকে প্রশ্ন করা শুরু করবে, “হয়তো আমি ভুল মনে করছি?”
গ্যাসলাইটিংয়ের পরবর্তী ধাপে, গ্যাসলাইটার আসল ঘটনাকে বিকৃত করে নতুন একটি বাস্তবতা তৈরি করে। তারা শিকারকে নিজের অনুভূতিতে অবিশ্বাসী করে তোলে, যাতে সে ধীরে ধীরে নিজের স্মৃতি নিয়ে সংশয় তৈরি করে।
উদাহরণ: আপনি যদি কিছু মনে করেন, যেমন “আমরা গত সপ্তাহে ওখানে গিয়েছিলাম,” গ্যাসলাইটার আপনাকে বলবে, “এটা কখনো হয়নি। তুমি তো ভুল মনে করছো।” এরপর, শিকার নিজের স্মৃতি নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করবে, "কী সত্যিই আমরা সেখানে গিয়েছিলাম?"
গ্যাসলাইটার শিকারকে একাকী করে তোলে। ধীরে ধীরে তারা অন্যদের বিশ্বাসও ফিরিয়ে নেয়, যাতে শিকার বুঝতে পারে যে, তার উপলব্ধি ভুল। এভাবে, সে এক ধরনের মানসিক বিচ্ছিন্নতা অনুভব করতে থাকে এবং নিজের অনুভূতি নিয়ে কোনো কাউন্সেল করতে চায় না।
উদাহরণ: যখন আপনি বলবেন, "এটা ঠিক নয়," তখন আশেপাশের সবাই গ্যাসলাইটারকেই বিশ্বাস করবে এবং বলবে, “এটা তো তোমার মনের ভুল। তোমার কিছু মনে হয়।” এতে শিকার এক ধরনের একাকীত্ব অনুভব করে, কারণ সে আর কাউকে তার অনুভূতি নিয়ে পরামর্শ করতে পারে না।
এই ধাপে, গ্যাসলাইটার শিকারকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। শিকার তার সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধা করতে শুরু করে এবং নিজের অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। গ্যাসলাইটার তার মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে।
উদাহরণ: শিকার যদি কিছু সিদ্ধান্ত নিতে চায়, গ্যাসলাইটার বলবে, “তুমি কখনও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারো না। তুমি যদি আমাকে বিশ্বাস না করো, তো তোমার কী হবে?” এবং একসময় শিকার অনুভব করবে যে, সে অন্যদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
গ্যাসলাইটিং-এর ফলে শিকার অনেক ধরনের মানসিক সমস্যা অনুভব করতে পারে:
বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া: শিকার তার নিজের উপলব্ধি নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করে এবং বাস্তবতা সম্পর্কে তার ধারণা বদলে যায়।
নিজের সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা: গ্যাসলাইটিংয়ের ফলে শিকার নিজের সিদ্ধান্তে ভয় পেতে শুরু করে।
অবিরাম অপরাধবোধ: শিকার মনে করে, "সমস্যাটা হয়তো আমার মধ্যেই আছে," এবং নিজের ভুলের জন্য নিজেকে দায়ী করে।
হতাশা ও বিষণ্নতা: গ্যাসলাইটিং থেকে আত্মবিশ্বাসের ক্ষতি হয়, যার ফলে হতাশা ও বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে।
গ্যাসলাইটিং থেকে মুক্তির জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ:
নিজের অনুভূতি বিশ্বাস করুন: নিজের অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিন, যদি কেউ তা অস্বীকার করে।
প্রমাণ সংগ্রহ করুন: আপনার কথাবার্তা বা ঘটনা রেকর্ড রাখুন, যাতে প্রমাণিত করতে পারেন।
বিশ্বাসযোগ্য মানুষের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখুন: যারা আপনার অনুভূতি বুঝতে পারে, তাদের সঙ্গে থাকুন।
স্বাধীনভাবে চিন্তা করুন: অন্যদের কথায় অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, নিজের বিচার ক্ষমতা ব্যবহার করুন।
মানসিক সহায়তা নিন: যদি মনে হয় আপনি গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার হচ্ছেন, একজন পেশাদার পরামর্শকের সহায়তা নিন।
গ্যাসলাইটিং এমন এক প্রক্রিয়া, যা আপনাকে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলে, কিন্তু কখনোই সরাসরি আঘাত করে না। এই প্রক্রিয়া আপনার মনের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করে, আপনার আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়, এবং আপনাকে আপনার বাস্তবতা নিয়ে বিভ্রান্ত করে ফেলে। তবে, এক কথা মনে রাখবেন – আপনার অনুভূতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ!